গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ের পর নতুন বিতর্কে বলিউড অভিনেতা আমির খান। আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে এক আলেমের ‘ফতোয়া’ এবং এক হিন্দু পুরোহিতের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে ভারতে আলোচনা চলছে।
বলিউড অভিনেতা আমির খান তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছেন। ভারতের এক মুসলিম ধর্মীয় আলেম তার এই আন্তঃধর্মীয় বিয়ের বিরোধিতা করে একটি ‘ফতোয়া’ জারি করেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
আমির খানকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় এক পুরোহিতের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হিন্দু ধর্মীয় নেতা মহন্ত রাজু দাস প্রকাশ্যে দাবি করেন, কেউ যদি আমির খানকে হত্যা করে, তাকে তিনি ৫ কোটি রুপি পুরস্কার দেবেন। তার অভিযোগ, আমির খান হিন্দু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন এবং তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ‘অগ্রহণযোগ্য’। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
বিতর্কিত এই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন অনেক রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী। তাদের বক্তব্য, মতপার্থক্য বা ধর্মীয় বিরোধ থাকলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতার আহ্বান বা পুরস্কার ঘোষণা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই মন্তব্যের বিষয়ে আমির খান বা তার প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআইকে উদ্ধৃত করে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মুসলিম পার্সোনাল দারুল ইফতার শাহী প্রধান মুফতি মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন দাবি করেছেন, শরিয়াহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষের অমুসলিম নারীকে বিয়ে করা বৈধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘একজন মুসলিমের জন্য অমুসলিম নারীকে বিয়ে করা হারাম।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের বিয়েকে পাপ হিসেবে স্বীকার না করাও ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ।
মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন শুধু আন্তঃধর্মীয় বিয়ের বিষয়েই আপত্তি জানাননি, আমির খানের এটি তৃতীয় বিয়ে হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, একাধিক বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং পুনরায় বিয়ে তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন প্রত্যেক স্ত্রীর প্রতি সমান দায়িত্ব ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তবে এই বিতর্ক নিয়ে এখন পর্যন্ত আমির খান বা তার মুখপাত্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
এরই মধ্যে আরেক সাক্ষাৎকারে আমির খান ‘লাভ জিহাদ’ বিতর্কেরও জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম কখনোই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল না। তার প্রথম স্ত্রী রিনা দত্ত, দ্বিতীয় স্ত্রী কিরণ রাও কিংবা বর্তমান স্ত্রী গৌরী স্প্র্যাট, কেউই বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তন করেননি। তিনটি বিয়েই ভারতের স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানান তিনি। ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আমির বলেন, ‘সময় যত যাচ্ছে, জীবন যেন আরও বাঙময় হয়ে উঠছে।’
আমির খান ও গৌরী স্প্র্যাট গত ৫ জুলাই মুম্বাইয়ের পালি হিলে অভিনেতার বাসভবনে ঘনিষ্ঠ স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নিবন্ধিত বিয়ে করেন। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পরিবর্তে তারা ছোট পরিসরের অনুষ্ঠানকেই বেছে নেন। এর আগে আমির নিজেই জানিয়েছিলেন, তারা খুবই সাধারণভাবে বিয়ে করতে চান এবং সবার আশীর্বাদ প্রত্যাশা করেন।
গৌরী স্প্র্যাট ভারতের বেঙ্গালুরুর একজন উদ্যোক্তা। তিনি বিউটি ও ওয়েলনেস খাতে কাজ করেন এবং সৌন্দর্যচর্চা, ত্বকের পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ভিত্তিক সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কয়েক বছর ধরে তাদের সম্পর্ক ছিল এবং ২০২৫ সালে আমির প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সেই সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। এটি আমির খানের তৃতীয় বিয়ে। এর আগে তিনি রিনা দত্ত এবং পরে চলচ্চিত্র নির্মাতা কিরণ রাওকে বিয়ে করেছিলেন। বিচ্ছেদের পরও দুই সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে তার পারিবারিক ও পেশাগত সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ রয়েছে।
ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা নীতেশ রানে সম্প্রতি আমিরের বিয়ে নিয়ে মন্তব্য করে ‘লাভ জিহাদ’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। তার এই বক্তব্যও দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতে আন্তঃধর্মীয় বিয়ে বহু বছর ধরেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে দেশটির সংবিধান এবং স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে আইনগতভাবে বিয়ের সুযোগ দেয়। ফলে ধর্মীয় আপত্তি থাকলেও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আমির খান ও গৌরী স্প্র্যাটের বিয়ে বৈধ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, সিয়াসাত ডটকম, এএনআই, সিনেমা এক্সপ্রেস।