দেশের রাজনীতি হঠাৎ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে ইন্টেরিম সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যখন তার পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন, সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয় মূহুর্তেই। ড. ইউনূসের সেই পদত্যাগের ভাবনা নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটের আপাত নিরসন হলেও প্রকৃত অর্থে সংকট কাটলো, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হলো, সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসছে। অনেকে বলছেন, ইউনূস সরকার আরো শক্ত হলো। অন্যপক্ষ বলছে, নড়বড়ে হলো ইন্টেরিম সরকার।
মূলত সরকারের দুই ‘ছাত্র‘ উপদেষ্টা ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক দাবির পাশাপাশি দলগুলোর নির্বাচনের জন্য তারিখসহ রোডম্যাপ চাওয়ার কারণে সামনে নতুন সংকটের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
আবার পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ শনিবার যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানেও ‘দলগুলোকে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দেয়ার সুর‘ আছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, সরকারের নিরপেক্ষতার স্বার্থেই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগসহ তাদের দাবিগুলো মেনে নেয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
অন্যদিকে নতুন দল এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলছেন, ‘পদত্যাগ জনিত‘ সংকটের নিরসন হয়েছে, কিন্তু বিএনপির নতুন নতুন শর্তের কারণেই সংকটের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের বলছেন, নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হলে সংকটের আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না বলেই তার ধারণা।
যদিও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মতে, সংকট আরও ঘনীভূত হওয়া আশঙ্কা করছেন তিনি। কারণ যেসব ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে পরিষ্কার ঘোষণা সরকারের কাছ থেকে এখনো আসেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন দাবি নিয়ে সরকারের ওপর হয়তো চাপ বাড়াচ্ছে বিএনপি, কিন্তু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে বিলম্ব হলে এসব দাবিকে ঘিরেই সংকট জোরদার হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সাথে সরকারের সম্পর্ক কেমন হয়, তাও সামনে দেখার বিষয় হবে বলে তারা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে করিডর, চট্টগ্রাম বন্দর ও নির্বাচনের তারিখ নিয়ে সম্প্রতি সেনাপ্রধানকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে যেসব বক্তব্য এসেছে, সেসব বিষয়ে সরকারের দিক থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য আসেনি।
ওই সংবাদ প্রকাশের পর বিএনপি পরিষ্কারভাবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছে।
“সেনাবাহিনীর সাথে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছে কার কারণে, সেটা চিহ্নিত করে আমরা তাকে সরিয়ে দেয়ার কথা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি। সেনাপ্রধান তো ভুল কিছু বলেননি,” বলছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ।
এছাড়া বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে আদালতের রায়ের পর শপথ নেয়ার দাবিতে কাকরাইল এলাকায় তার সমর্থকদের অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে, উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে যে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও বিএনপির পছন্দ হয়নি।
শনিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিলো, ‘বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অযৌক্তিক দাবিদাওয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও এখতিয়ার–বহির্ভূত বক্তব্য এবং কর্মসূচি দিয়ে যেভাবে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে এবং জনমনে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বৈঠকে‘।
সালাউদ্দিন আহমদ বলছেন, “আদালতের রায়ের পর ইশরাককে শপথ না পড়ালে তার সমর্থকরা রাস্তায় নামলে সেই দায় তো তাদের হতে পারে না। এটি জনগণের অধিকার“।
উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে ‘এখতিয়ার–বহির্ভূত‘ শব্দগুলো উল্লেখ করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সেনাপ্রধানের উদ্ধৃতি দিয়ে করিডর, বন্দর ও নির্বাচনের তারিখ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ আসার পর সরকার সমর্থকরা অনেকে এই শব্দগুলো ব্যবহার করে নানা প্রচার প্রচারণা করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গত শুক্রবার একটি ফেসবুক পোস্টে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে লিখেছিলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের বক্তব্যে সেনাপ্রধান জুরিশডিকশনাল কারেক্টনেস রক্ষা করতে পারেননি‘। সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর এটা ছিল সরকারি কোন কর্মকর্তার প্রথম মন্তব্য। যদিও পরে তিনি সেই স্ট্যাটাস মুছে ফেলেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলছেন, “উপদেষ্টা পরিষদ যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানে এক ধরনের পরোক্ষ চাপ ও হুমকি দেখছি রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে, যা শুভ লক্ষণ নয়‘।
তিনি বলেন, “সংকটের গভীরতাই সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না। নিজেদের নিরপেক্ষতার বিষয়েও তারা মনোযোগী নয়। আবার সরকারের যেসব বিষয়ে প্রশ্ন এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে অবস্থানও সরকার পরিষ্কার করেনি। ফলে সংকট সামনে আরও ঘনীভূত হতে পারে“।
সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের প্রসঙ্গ এনেছে। বিএনপির সমমনা দলগুলোও বিএনপির এ অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
“যারা বিতর্কিত তাদের সরাতে হবে। ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে নতুন দলের যোগসাজশ আছে।তাদের সরিয়ে দিলেই সরকারের সমালোচনা বন্ধ হতে পারে। এটিই আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি,” বলেছেন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ।
নতুন দল অর্থাৎ এনসিপির আরিফুল ইসলাম আদীব বলছেন, ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টাকে সব দল যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তা থেকে বড় রাজনৈতিক দলটি সরে এসেছে। তারাই এখন নতুন নতুন শর্ত দিয়ে সংকটের বীজ বপন করছে। বড় দল ডিকটেট করবে আর প্রধান উপদেষ্টা সে অনুযায়ী কাজ করবে সেজন্য তো তাকে ছাত্র জনতা আনেনি।
তবে সবগুলো দলই বলছে যে, তারা চান না অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এখনি সরকার ছেড়ে যান বরং তারা চান তার নেতৃত্বেই দ্রুত নির্বাচন হোক। এক্ষেত্রে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে আর জামায়াত ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিলে নির্বাচন হতে পারে বলে জানিয়েছে। এনসিপি বিচার ও সংস্কার এগিয়ে নির্বাচনের কথা বলছে।
কিন্তু তিন উপদেষ্টার পদত্যাগের ইস্যুটি কতদূর গড়ায় কিংবা বিএনপি এই বিষয়ে কতটা অনড় হয়, তার ওপর সামনের পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে বলেও অনেকে মনে করছেন।
যদিও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ মোঃ আব্দুল্লাহ তাহের বলছেন, তারা সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং তার ধারণা নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এলেই এসব বিষয়ে সংকট আর থাকবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের চেয়ারপার্সন রাজনীতিক বিশ্লেষক শারমীন আহমেদ বলছেন, “বিএনপির মতো একটা বড় দলের দাবিকে সরকার কীভাবে সামলাবে সেটার ওপর নির্ভর করবে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি হবে কি–না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা মাধ্যমে দলটি আস্থায় এনে আলোচনার সুযোগও সরকারের সামনে আছে“।
তার মতে, নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংকট এড়াতে সংস্কারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেও কাজ করতে হবে।