হরমুজে ট্যাংকারে হামলা, ভারতীয় নাবিক নিহত

প্রিয়দেশ ডেস্ক
15 July 2026 12:56 am
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আবার মুখোমুখি। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবার আরও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে দুটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার খবর প্রকাশের পর নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ এবং ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটির দুটি জাতীয় ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রাণ হারান একজন ভারতীয় নাবিক। আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় ও দুজন ইউক্রেনের নাগরিক রয়েছেন, যাদের চারজনের অবস্থা গুরুতর। ইউএই এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হামলার দায় স্বীকার করলেও তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ট্যাংকার দুটি সতর্কবার্তা অমান্য করে নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখে মাইন পাতা একটি রুট দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছিল। তাই সেগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে যদি কেউ তাদের ভাষায় “আগ্রাসী শক্তিকে সহযোগিতা” করে।

এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, এই জলপথ ব্যবহার করে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করা হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে “হরমুজ প্রণালির অভিভাবক” হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে একতরফাভাবে কোনো রাষ্ট্রের টোল বা চার্জ আরোপের আইনি ভিত্তি নেই। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ইতোমধ্যে জানিয়েছে, কেবল কোনো আন্তর্জাতিক প্রণালি অতিক্রম করার জন্য বাধ্যতামূলক ফি আরোপ আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অবশ্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কূটনৈতিক ভাষায় কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির প্রকৃত অভিভাবক ইরান ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ২০ শতাংশ চার্জের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেন, “২০ শতাংশ অনেক বেশি, আমরা আরও ন্যায্য হব।” এই বক্তব্যে যেমন বিদ্রূপের সুর রয়েছে, তেমনি ইঙ্গিত রয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান কোনোভাবেই পিছু হটতে প্রস্তুত নয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ইরানের বুশেহর, বান্দার আব্বাস, জাস্ক, কোনারাক, চাহবাহার ও আবু মুসাসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে। জবাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যে কোনো সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, শিপিং শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এই ঘটনার মানবিক দিকও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিহত ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় দিতে হয় সাধারণ নাবিক, জাহাজকর্মী ও বেসামরিক মানুষকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্রে দায়িত্ব পালনকারী এসব মানুষের জীবন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি একটি কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে। অতীতেও আলোচনার আগে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করে দর-কষাকষির কৌশল গ্রহণ করতে দেখা গেছে তাকে। তবে এই কৌশল সফল হবে, নাকি উল্টো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

ইরানও বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি সামরিক আধিপত্য মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান যতদিন অনড় থাকবে, ততদিন এই প্রণালি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অস্থির কেন্দ্র হিসেবেই থাকবে।

এখন নজর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিকে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কূটনৈতিক সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব পড়বে তেলের দাম থেকে শুরু করে বিশ্ববাজারের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও।

সূত্র: বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স