মায়ের পতাকা বইতে পারবেন কি তারেক রহমান?

1 January 2026 9:10 pm
২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ার পর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন তারেক রহমান।

২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ার পর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন তারেক রহমান।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এক শোকাতুর জনপদে পরিণত হয়। যখন হাসপাতাল থেকে খবর আসে: তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই।

২৩ নভেম্বর রাত থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালের গেটের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন সমর্থক, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ; অনেকের চোখেই ছিল জল। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলছিলেন, এই খবর শুনে ঘরে থাকা অসম্ভব ছিল। যেহেতু তাঁকে দেখার সুযোগ নেই, তাই সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে। সবার চোখেই জল।

বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে খালেদা জিয়ার প্রভাব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে কতটা বিস্তৃত ছিল।

তবে শোকের বাইরেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির জন্য একটি সংকটময় মুহূর্তে বড় ধরণের রাজনৈতিক বিচ্ছেদ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দল এমন এক সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছে যখন তাদের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে পরিচিত নেত্রীকে তারা হারিয়েছে।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বিএনপিকে পুরোপুরি খালেদা-পরবর্তী যুগে প্রবেশ করাল। এতে দলের সব ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার কেন্দ্রবিন্দু এখন তাঁর পুত্র ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর তারেক রহমানকেই এখন দলকে সুসংগঠিত করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

উত্তরাধিকার যখন নোঙর, অনুপস্থিতি তখন পরীক্ষা কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা কেবল আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। তাঁর ছায়া থাকলেই দলে উপদলীয় কোন্দল কম হতো এবং নেতৃত্বের লড়াই চাপা থাকতো।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ একজন “প্রকৃত অভিভাবক” হারিয়েছে। খালেদা জিয়া ছিলেন সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক। তিনি জানান, বিএনপি নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়ার নীতি ও সুশাসনকেই অগ্রাধিকার দেবে। মাহদী আমিনের দাবি, হাসিনাশাসিত ১৫ বছরের শাসনকালে ধ্বংস হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারে তারেক রহমান ইতিমধ্যে নিজেকে এক ঐক্যবদ্ধ নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে স্থিতিশীলতা যোগাতো, তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলটিকে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখত। তিনি বলেন, “এখন সেই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটবে। তারেক রহমানকে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তাঁর নেতৃত্ব এখনো পরীক্ষিত নয়।”

মহিউদ্দিন আহমদ স্মরণ করিয়ে দেন যে, খালেদা জিয়া নিজেও একসময় অপরীক্ষিত নেতা ছিলেন। ৮০-র দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় নেতৃত্বে উঠে এসেছিলেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেক রহমানের জন্যও একই রকম নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে: জয় তাঁর নেতৃত্বকে বৈধতা দেবে, আর ব্যর্থতা তাঁর ওপর চাপ বাড়াবে।

কঠিন এক নির্বাচনী ময়দান বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জটি আরও জটিল, কারণ বিরোধী শিবিরের দৃশ্যপট বদলে গেছে। দীর্ঘ তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বিমুখী লড়াই। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে নেই। ইউনূস সরকার তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে।

এই শূন্যস্থানে এখন বড় খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী জোট। এই জোটে আছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), যা মূলত জুলাই বিপ্লবের ছাত্রনেতারা গঠন করেছেন। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিএনপির জন্য এটি সহজ হবে না। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে এবং দুই দলের আধিপত্য আর কার্যকর নেই।”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলের ভেতরে বিভক্তির আশঙ্কা কমিয়ে দিয়েছে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল ছিল। খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমান সেই স্থানটি দখল করবেন এটাই স্বাভাবিক।

উত্তরাধিকার থেকে ম্যান্ডেট তবে বিএনপি নেতারা স্বীকার করেন যে, কেবল উত্তরাধিকারের দোহাই দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে না। তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মী মনে করেন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামলানো তারেক রহমানের জন্য বড় কাজ হবে। যুবদলের কক্সবাজারের চকরিয়া ইউনিটের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন বলেন, “অতীতের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে দ্বিমত ছিল, যারা খালেদা জিয়ার সাথে কাজ করেছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তবে আমি বিশ্বাস করি তিনি তা সামলে নিতে পারবেন।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন না। তিনি বলেন, “তাঁর নেতৃত্ব ইতিমধ্যে প্রমাণিত।”

সাধারণ সমর্থকদের কাছে এই রাজনীতি গভীর আবেগ ও ব্যক্তিগত স্মৃতির। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়া স্মৃতিচারণ করেন, ১৯৭৯ সালে যখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর ধানক্ষেতে গিয়ে হাত মিলিয়েছিলেন। দুলাল মিয়া বলেন, “তারেক রহমানকে তাঁর বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। যদি তিনি তা না করেন, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিএনপির রাজনীতি মানুষের রাজনীতি। যদি তিনি এটি ধরে রাখতে না পারেন, তবে মানুষই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে।”

সূত্র : আল জাজিরা