গত চার সপ্তাহ ধরে স্তব্ধ হয়ে আছে পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে কার্যত বন্ধ জ্বালানি বাণিজ্যের এই প্রধান সমুদ্রপথ। মানচিত্রের এই সরু ২৪ মাইলের চোকপয়েন্ট এখন পরিণত হয়েছে এক ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরীতে। যেখানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, আর বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জ্বালানির জন্য হাহাকার।
কেন অসহায় পরাশক্তিরা?
মার্কিন নৌবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও ইরানের ‘অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি’র কাছে তারা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সিএনএন ও লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, ইরানের পাল্লা ভারী হওয়ার পেছনে রয়েছে তিনটি মূল কারণ:
অপ্রচলিত সমরাস্ত্র: বড় সাবমেরিন নয়, বরং অগভীর পানিতে চলাচলকারী ‘মিজেট সাবমেরিন’, বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন এবং সাধারণ পালতোলা নৌকা থেকে পাতা সামুদ্রিক মাইন এখন প্রধান আতঙ্ক।
ভৌগোলিক ঢাল: ইরানের ১০০০ মাইল দীর্ঘ উপকূলরেখা পাহাড়, উপত্যকা ও দ্বীপে ঘেরা। এখান থেকে ভ্রাম্যমাণ মিসাইল ব্যাটারি উৎক্ষেপণ করে নিমিষেই লুকিয়ে পড়া যায়, যা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
বিকল্পহীন পথ: রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ

মানচিত্রের এই সরু ২৪ মাইলের চোকপয়েন্ট এখন পরিণত হয়েছে এক ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরীতে
কেভিন রোল্যান্ডস বলছেন, উন্মুক্ত সমুদ্রে রুট বদলানো যায়, কিন্তু এখানে সেই সুযোগ নেই। ইরানকে লক্ষ্যবস্তু খুঁজতে হয় না, তারা কেবল বসে অপেক্ষা করলেই চলে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) নেভাল ফোর্সেস অ্যান্ড ম্যারিনটাইম সিকিউরিটি বিভাগের সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, ‘যৌক্তিক কারণেই হরমুজকে “চোকপয়েন্ট” (সরু পথ) বলা হয়। বিশ্বে এমন আরও অনেক চোকপয়েন্ট থাকলেও এটি অনন্য চ্যালেঞ্জের। কারণ এর কোনো বিকল্প পথ নেই।’
অর্থনীতির নতুন সমীকরণ: ‘সেফ প্যাসেজ ফি’
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই অচলাবস্থার মধ্যেও ইরান তার নিয়ন্ত্রণকে ব্যবসায়িক লাভে রূপান্তর করছে। ২৩ মার্চের ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’ রিপোর্ট বলছে, অন্তত দুটি জাহাজ মোটা অঙ্কের অর্থ বা ‘টোল’ পরিশোধ করে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছেছে। ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে তারা জাহাজ পার করে দেওয়া অব্যাহত রাখবেন।
ট্রাম্পের কূটনৈতিক ও সামরিক দোটানা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় জাহাজ পার করার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু সংকীর্ণ শিপিং লেনে পথ পরিবর্তনের জায়গা না থাকায় এই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সামরিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।