বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, তার ফেরার পথে কোনো আইনগত বাধা নেই। তবুও তিনি কেন ফিরছেন না—সে প্রশ্নের জবাব মিলছে না, ফলে বিএনপির ভেতরে-বাইরে নানা জল্পনা তীব্র হচ্ছে।
দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত তারেক রহমান বিদেশে থেকে ভার্চুয়াল নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে সচল রেখেছেন। কিন্তু দীর্ঘ অনুপস্থিতি এখন দলের জন্য এক ‘গুরুত্বপূর্ণ সংকট’-এ পরিণত হয়েছে। এতে শুধু বিএনপির ভেতরেই হতাশা বাড়ছে না, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। পরে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তিনি কার্যত বিএনপির প্রধান নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তবে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দিন দিন দলের ভেতরে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
বিএনপি নেতারা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন—কেউ বলছেন নির্বাচনের আগেই ফিরবেন, কেউ বলছেন যেকোনো সময় আসতে পারেন। কিন্তু এসব ঘোষণায় বরং প্রশ্নই বাড়ছে—দলীয় নেতাকর্মীদের অন্ধকারে রাখা হচ্ছে কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য মূলত কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার কৌশল। বাস্তবে পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা না থাকায় দলটির ঐক্য ও মাঠের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
২০০৮ সালে দেশ ছাড়ার সময় তারেক রহমান সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১) কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে মানবিক কারণে বসবাস করছেন। দেশে ফিরে গেলে সেই অবস্থান হারাবেন, আর বিপদে পড়লে ফের যুক্তরাজ্যে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকার তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা তারেককে আশ্বস্ত করতে পারছে না।
এই অনিশ্চয়তার কারণে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষত জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যেই মাঠে এবং প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভার্চুয়াল নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীলতা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকেও ভঙ্গুর করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। তারা ভেবেছিলেন, এবার তারেক রহমান ফিরবেন এবং নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করবেন। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, সেই প্রত্যাশা হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও যুগ্ম মহাসচিব এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ শীর্ষ নেতারা বারবার আশ্বাস দিয়েছেন—তারেক ফিরবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে না পারায় সেই আশ্বাসও এখন আর কার্যকর হচ্ছে না।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা এখন আর কেবল বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের আগে তিনি ফিরতে পারলে বিএনপি নতুন উদ্দীপনা পেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ অনিশ্চয়তা দলকে যে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা পুষিয়ে নেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্তের ওপর।