বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনগুলো কাজ করে চলেছে। তারা ইতিমধ্যে প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। এখন প্রতিবেদনের প্রধান প্রধান সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পালা। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের নানা খাতে গেড়ে বসা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূ্র করার জন্য এই সুপারিশগুলো যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে ততই মঙ্গল। না হলে আগের ধংসের ধারাতেই রয়ে যাবে দেশ।
কিন্তু এরইমধ্যে দেশের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন চাচ্ছে। অথচ ভোটের কথা যদি আসে সবার আগে দরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সেটি তারা চাচ্ছে না। তাদের মনে রাখা দরকার মানুষ যখন বিশ্বাস করে ফেলবে যে তারা ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগের সুরে সুর মিলিয়ে ভারতের হয়ে নির্বাচন চাচ্ছে, তখন কিন্তু তারা অস্তিত্ব হারাতে পারে।
আগামী বছর জুনের মধ্যে ভোট আয়োজন করার কথা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে অন্তবর্তী সরকার। এই প্রস্তাব মেনে নিন। নাহলে ছাত্রজনতার দাবিতে বিপ্লবী সরকারও গঠন হতে পারে দেশে। এই সরকারের মেয়াদ হতে পারে কমপক্ষে ১০ বছর। ড. মুহাম্মদ ইউনুস আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে যে মানের মানুষ তাতে তার কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে টিকে থাকা সহজ হবে না। সেনাবাহিনী ভুলেও এ কাজ করবে না। ফলে নির্বাচন নিয়ে হৈচৈ না করে সংস্কার কাজে সহায়তা করুন। নিজ দলের নেতাকর্মীদের অপকর্ম ঠেকান। মানুষ বিরক্ত হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের কমেন্ট সেকশন খেয়াল করলেই বুঝবেন। জনগণ কিন্তু জানে এবং বোঝে। তারা দেখছে ৬ আগস্ট থেকে কারা চাঁদাবাজি করছে? টেন্ডার বাণিজ্য করছে? সিন্ডিকেট বাণিজ্য করছে? সরকারি অফিসের ঘুষ বাণিজ্য করছে?

রাষ্ট্রের প্রধানতম খাতগুলোর সংস্কার না করলে ভবিষ্যত আর বদলাবে না।
দেশবাসী সবাই জানে। আপনারাও জানেন। এই সমস্যা কিন্তু আপনারা ক্ষমতায় গেলে আরো বাড়বে। পারবেন কি ঠেকাতে? না পারলে জনগণ কিন্তু টেনে নামাবে আওয়ামী লীগের মতোন। তখন কিন্তু চিরতরে মুছে যাবেন রাজনীতির ইতিহাসের পাতা থেকে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। বিপ্লবী সরকারকে সহায়তা করুন। দেশের ভবিষ্যত নিজেরাই গড়ে তুলুন।
নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের শাসনভার হস্তান্তর হয়। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঠিক ম্যাকানিজমই তো গত ৫৩ বছরে তৈরি করা যায়নি। সেই সিস্টেম আগে ঠিক করা হোক। জুলাই অভ্যূত্থানে এতগুলো তরতাজা প্রাণ বলিদানের পরও যদি আমরা সেই সিস্টেম ঠিক করতে না পারি, এটি অপরাধ তো বটেই, পাপও হবে আমাদের জন্য। তাই নির্বাচন-নির্বাচন না করে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার জন্য সবাই মিলে কাজ করুন। ড. ইউনূসের সরকারকে সহায়তা করুন। মনে রাখবেন, যে সিস্টেমে একটা দলই সব ভোট পেয়ে যেতে পারে, সে সিস্টেম ঠিক না করা অবধি একনায়কতন্ত্রই তৈরি হবে। তো যদি একনায়কতন্ত্রই আনবেন নির্বাচনের নামে কেন? সিংহাসনে বসিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়! সরকারের টাকাও বাঁচে, জনগণও বাঁচে।
দেশ ও জনগণের ইচ্ছের কথা জানুন। তারা সংস্কারের আগে ভোট চায় না। বরং ভোট নিয়ে চিল্লাচিল্লিতে তারা বিরক্ত। সরকারের সাথে বসুন। সহযোগিতা করুন। পুলিশ এই এতোদিনেও সক্রিয় হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পাশে দাঁড়ান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে এই সরকারকে দোষ দিতে পারেন না, কারণ এই প্রশাসন ক্ষমতাচ্যূত সরকারের প্রশাসন। তাদেরকে বাগে আনতে সোচ্চার হোন। পুলিশ ঠিক না করে ভোট করবেন কীভাবে? কেন এত উতলা হচ্ছেন ভোট নিয়ে? ভোট করে হয়তো জিততে পারবেন, কিন্তু সিস্টেম ঠিক না করে ভোট হলে সেই বিজয় কতদিন স্থায়ী হবে বলতে পারেন? টিকতে পারবেন না। দেশের জনগণ এখন সচেতন হয়ে গেছে। গদি থেকে নামাতে বেশি সময় লাগবে না।
জুন মাস শুরু হল। আসছে জুন মাসে নির্বাচন। আর তো মাত্র একটি বছর। অপেক্ষা করেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণদানের পর অনেক তো পেয়েছেন। দলীয় মামলা শেষ। নেত্রী মুক্ত। নেতাও মামলাজট থেকে মুক্ত। প্রশাসনেও আপনারা। সরকারেও আপনাদের প্রতিনিধি আছে। শুধু ক্ষমতায় আসার বাকী। আসবেন। তার আগে নিজের প্রয়োজনেই একটা বছর দলটাকে বিনা বাঁধায় ঢেলে সাজান।
একটি সরকার হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও পাহাড়সমান অর্থ পাচার করে পালিয়ে গেছে। সেসবের বিচার, সম্পদগুলো ফেরত আনার সুযোগ এই সরকারকে দেবেন না? দেশের মানুষ কি রাস্তায় নেমেছিল শুধু একটি নির্বাচনের জন্য? ড. ইউনুসের সততা ও মেধাকে একটু কাজে লাগাতে দিন। তার অর্থ ও ক্ষমতা কোনোটিরই দরকার নেই। তিনি যে সম্মান অদ্যাবধি অর্জন করেছেন, যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তার আর কোনো কিছুর দরকার নেই।
ধৈর্য ধরুন। ধৈর্য হারালে আওয়ামী লীগের মতো আম-ছালা দুটোই হারাবেন আপনারা।