ঘরের খাবার খেয়েও কেন মোটা হচ্ছে মানুষ?

অনুভব রহমান 
17 June 2026 3:06 am
প্রক্রিয়াজাত খাবার ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ বৃদ্ধি করছে

প্রক্রিয়াজাত খাবার ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ বৃদ্ধি করছে

একসময় অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতাকে ধনী দেশের সমস্যা মনে করা হতো। এখন সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন এক নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অনেক মানুষই দাবি করেন তারা নিয়মিত ঘরের রান্না করা খাবার খান, বাইরে খুব একটা খান না, তবু ওজন ক্রমাগত বাড়ছে।

ভারতের সাম্প্রতিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণ বলছে, সমস্যার মূল শুধু বাইরের খাবার নয়; বরং কী খাওয়া হচ্ছে, কতটুকু খাওয়া হচ্ছে, কীভাবে জীবনযাপন করা হচ্ছে এবং শরীর কতটুকু শক্তি ব্যয় করছে, এসবের সমন্বিত প্রভাবেই বাড়ছে ওজন।

ভারতের জাতীয় পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ সম্প্রতি খাদ্য নির্দেশিকায় সতর্ক করেছে যে আধুনিক নগরজীবনে মানুষের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, চিনি, তেল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রবেশ ঘটেছে।  ফলে ঘরের রান্না করা খাবার হলেও সেটি সবসময় স্বাস্থ্যকর হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের শহুরে পরিবারে হোম-কুকড ফুড বলতে অনেক সময় বোঝানো হচ্ছে অতিরিক্ত সাদা চাল, পরোটা, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তেলযুক্ত তরকারি, মিষ্টিজাত খাবার এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত নাশতা। এগুলো ঘরে তৈরি হলেও শরীরে ক্যালরি যোগ করে বিপুল পরিমাণে। অন্যদিকে ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, আঁশসমৃদ্ধ শস্য এবং পর্যাপ্ত প্রোটিনের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, আধুনিক নগরজীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে। কয়েক দশক আগে দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশজুড়ে ছিল হাঁটা, সাইকেল চালানো, বাজার করা কিংবা হাতের কাজ। এখন অফিস, স্কুল, বাসা সবখানেই বসে থাকার সময় বেড়েছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের মানুষের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং এটি স্থূলতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় মানুষের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, কম হাঁটা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে খাবারের প্রকৃতিতে। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘরের খাবারের পাশাপাশি মানুষের খাদ্যতালিকায় নীরবে জায়গা করে নিয়েছে তথাকথিত আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার। বিস্কুট, চিপস, প্যাকেটজাত নাশতা, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কোমল পানীয়, মিষ্টি পানীয়, প্রক্রিয়াজাত সস, এমনকি কিছু তথাকথিত স্বাস্থ্যকর সিরিয়ালও এই তালিকায় পড়ে। এসব খাবারে সাধারণত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং বিভিন্ন সংযোজক উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার গত দুই দশকে বিস্ফোরণধর্মী হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রকোপ।

ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যতালিকায় নিম্নমানের পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের আধিক্য ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, শুধু চাল বা আটা বদলালেই সমাধান হয় না; বরং মোট খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন আনতে হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষ মনে করেন তারা যেহেতু বাইরে খাচ্ছেন না, তাই তাদের ওজন বাড়ার কথা নয়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ওজন বৃদ্ধি ঘটে তখনই, যখন শরীরে প্রবেশ করা শক্তির পরিমাণ ব্যয় হওয়া শক্তির চেয়ে বেশি হয়। সেই অতিরিক্ত শক্তি ধীরে ধীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে। ঘরের খাবারও যদি অতিরিক্ত ক্যালরি, চিনি ও তেলে ভরপুর হয় এবং তার সঙ্গে যদি থাকে বসে থাকা জীবনযাপন, তাহলে ওজন বাড়বেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণও একই বার্তা দিচ্ছে। আধুনিক নগরজীবনে স্থূলতা কেবল ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, কর্মসংস্কৃতি, খাদ্যবাজার, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ফলে প্রশ্নটি আর শুধু “বাইরের খাবার না ঘরের খাবার” নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো খাবারের গুণগত মান কেমন, কতটুকু খাওয়া হচ্ছে, মানুষ কতটা সক্রিয় জীবনযাপন করছে এবং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য কতটা বজায় থাকছে।

স্থূলতার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্ট: ঘরের খাবার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র ঘরে রান্না করা হলেই কোনো খাবার স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। পুষ্টিগুণ, পরিমাণ, বৈচিত্র্য এবং সক্রিয় জীবনযাপন, এই চারটির সমন্বয়ই সুস্থ শরীরের আসল চাবিকাঠি।